সাম্প্রতিক প্রকাশিত

10/recent/ticker-posts

টেস্ট অফ চেরি : জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখায় দর্শন


✍︎
টেস্ট অফ চেরি : জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখায় দর্শন
 
আব্বাস কিয়ারোস্তামি-টেস্ট অফ চেরি (মূল নাম : তাম-এ গিলাস) সিনেমাটি প্রায় ৯৫ মিনিটের, সম্পূর্ণ ফার্সি ভাষায় নির্মিত, এবং এর কাহিনি অত্যন্ত সরল হলেও দার্শনিক জটিল। একজন মানুষের জীবনের শেষ দিনের সন্ধান, মৃত্যুর প্রস্তুতি, এবং মৃত্যুর কারণ খোঁজার এক যাত্রা চলচ্চিত্র।
 
সিনেমাটি শুরু হয় মিস্টার বাদিই নামের এক মধ্যবয়সী তার রেঞ্জ রোভার গাড়ি নিয়ে প্রান্তিক এলাকায় ধুলোময় রাস্তা দিয়ে চলার দৃশ্য দিয়ে। প্রথম দৃশ্যগুলোতে কোনো সংলাপ নেই, শুধু গাড়ির শব্দ, এবং বাইরের পরিবেশের শব্দ শোনা যায়। বাদিই বিভিন্ন শ্রমিক, সৈনিক এবং অন্যান্য পথচারীদের তুলে নিতে চেষ্টা করেন, কিন্তু তারা সন্দেহ করে এবং উঠতে অস্বীকার করে।
 
ধীরে ধীরে জানা যায়, বাদিই একটি কাজ করার জন্য কাউকে খুঁজছেন। তিনি এমন কাউকে চান যে পরদিন ভোরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে তাকে ডাকবে। যদি তিনি উত্তর দেন, তাহলে তাকে তুলতে সাহায্য করবে এবং যদি উত্তর না দেন, তাহলে তার উপর মাটি চাপা দিয়ে দেবে। এই কাজের বিনিময়ে তিনি দুলাখ তুমান (ইরানি মুদ্রা) দেবেন।
 
পুরো সিনেমা জুড়ে বাদিই তিনজন যাত্রীকে তুলে নেন এবং তাদের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে লিপ্ত হন। প্রতিটি কথোপকথন জীবন, মৃত্যু, ধর্ম, নৈতিকতা এবং মানবিকতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে।
 
 
প্রথম যাত্রী
একজন তরুণ কুর্দি সৈনিক, যে ব্যারাকে ফিরছিল। বাদিই তাকে তুলে নেন এবং ধীরে ধীরে তার প্রস্তাব দেন। যুবকটি প্রথমে বুঝতে পারে না, কিন্তু যখন বুঝতে পারে যে বাদিই তাকে মৃত্যুর সাথে জড়িত একটি কাজে সহায়তা করতে বলছেন, তখন সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সে অস্বস্তিকর নীরবতায় বসে থাকে, এবং প্রথম সুযোগেই গাড়ি থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায়।

দ্বিতীয় যাত্রী
একজন আফগান ধর্মতত্ত্বের ছাত্র, যে একটি সেমিনারি থেকে ফিরছিল। বাদিই তাকে তুলে নিয়ে আবারও তার প্রস্তাব রাখেন। এই যুবকটি আগের সৈনিকের চেয়ে বেশি গভীর এবং ধার্মিক। সে বাদিইকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে আত্মহত্যা হারাম এবং জাদুকর মানুষকে জীবন দিয়েছেন, তাই সেটা কেড়ে নেওয়ার অধিকার মানুষের নেই।
 
বাদিই শুনতে থাকেন, কিন্তু তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সেমিনারিয়ান অবশেষে বলে যে সে এই কাজে অংশ নিতে পারবে না কারণ এটি পাপ। বাদিই তাকে নামিয়ে দেন। এই দৃশ্য ধর্মীয় নৈতিকতা বনাম ব্যক্তিগত হতাশার দ্বন্দ্ব তুলে ধরে। ধর্ম উত্তর দিতে পারে, কিন্তু সেই উত্তর সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
 
তৃতীয় যাত্রী
হলেন মিস্টার বাঘেরি, একজন বয়স্ক আজেরি ট্যাক্সিডার্মিস্ট (যিনি মৃত প্রাণীদের চামড়া সংরক্ষণ করেন)। তিনি বাদিইয়ের প্রস্তাব শুনে একদম ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি রাজি হন টাকার জন্য (তার অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার জন্য টাকা প্রয়োজন), কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি বাদিইকে একটি ব্যক্তিগত গল্প বলেন যা সিনেমার হৃদয় এবং মূল বার্তা।
 
বাঘেরি জানান যে তিনিও একসময় আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে, জীবনে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে, তিনি একটি তুঁত গাছ থেকে দড়ি দিয়ে ঝুলে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি গাছে উঠেছিলেন, তখন তার শরীরে অসংখ্য পাকা তুঁত পড়তে শুরু করে। তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি তুঁত মুখে নিয়েছিলেন এবং তার স্বাদ পেয়েছিলেন—মিষ্টি, রসালো, জীবন্ত। তারপর তিনি আরও কয়েকটি খেয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি গাছ থেকে নেমে এসে পকেট ভরে তুঁত নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—জীবনের এই ছোট ছোট স্বাদ, এই সাধারণ আনন্দগুলোই বেঁচে থাকার কারণ।
 
বাঘেরি বাদিইকে বলেন, তুমি কি চাঁদ দেখতে চাও না? তারাভরা আকাশ? সূর্যোদয়? পাখির ডাক? তিনি জীবনের সৌন্দর্যকে, প্রকৃতির নিত্যনতুনত্বকে, এবং প্রতিটি ঋতুর বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেন। তিনি বাদিইকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে জীবন শুধু বড় বড় ঘটনা নয়, এটা ছোট ছোট মুহূর্তের সমষ্টি— একটি চেরি বা তুঁতের স্বাদ, একটি শিশুর হাসি, একটি সূর্যাস্ত। এই কথোপকথন সিনেমার শিরোনাম টেস্ট অফ চেরি-র ব্যাখ্যা করে।
 
বাদিই নীরবে শোনেন। তার মুখে কোনো আবেগ ফুটে ওঠে না। বাঘেরি তবুও রাজি হন পরদিন সকালে আসতে, এবং বাদিই তাকে ঠিকানা বুঝিয়ে দেন। তারা বিদায় নেয়।
 
সন্ধ্যা নামে। বাদিই একা বাড়ি ফেরেন, সবকিছু গুছিয়ে রাখেন, এবং রাতের অন্ধকারে পাহাড়ি এলাকায় চলে যান যেখানে তিনি আগে একটি গর্ত খুঁড়ে রেখেছিলেন। তিনি একটি গাছের পাশের খোলা কবরে শুয়ে পড়েন। রাতের আকাশে মেঘ জমছে, ঝড় আসছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাদিই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করেন। পর্দা কালো হয়ে যায়—দীর্ঘ, নিস্তব্ধ অন্ধকার।
 
অন্ধকারের পর হঠাৎ করে পর্দায় আলো ফিরে আসে, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ফরম্যাটে। ৩৫ মিমি ফিল্মের পরিবর্তে গ্রেইনি ভিডিও ক্যামেরায় তোলা ফুটেজ দেখা যায়। ঋতু যেন বদলে গেছে—আগে যেখানে শুষ্ক, ধুলোময় পাহাড় ছিল, সেখানে এখন সবুজ ঘাস এবং ফুল ফুটে আছে। ক্যামেরা ক্রু, সাউন্ড রেকর্ডিস্ট, এবং আব্বাস কিয়ারোস্তামি নিজে দৃশ্যমান হন। অভিনেতা হোমায়ুন এরশাদি (বাদিই) গর্ত থেকে উঠে আসেন, সিগারেট ধরান, এবং কিয়ারোস্তামিকে দেন। তারা হাসছেন, কথা বলছেন।
 
সৈন্যরা মার্চ করছে (সিনেমার আগের একটি দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি, কিন্তু এবার বাস্তব ক্রু এবং অভিনেতাদের সাথে)। কিয়ারোস্তামি তাদের বিশ্রাম নিতে বলছেন গাছের ছায়ায়। Louis Armstrong-এর ট্রাম্পেট বাজানো St. James Infirmary Blues’ সংগীতটি পটভূমিতে বেজে উঠে—একটি জ্যাজ গান যা মৃত্যু এবং শোক নিয়ে, কিন্তু একই সঙ্গে জীবন উদযাপন করে।
 
কিয়ারোস্তামি সিনেমাটির অধিকাংশ দৃশ্য দুইভাবে তুলেছেন : গাড়ির ভেতর থেকে এবং গাড়ির বাইরে থেকে। গাড়ির ভেতরের দৃশ্যে ক্যামেরা বাদিই এবং তার যাত্রীদের মুখ ক্লোজ-আপে দেখায়। মজার ব্যাপার হলো, দুই চরিত্র কখনো একসঙ্গে একই ফ্রেমে দেখা যায় না—এটি শট-রিভার্স-শট পদ্ধতিতে করা। এই কৌশলটি দর্শকদের প্রতিটি চরিত্রের ব্যক্তিগত জায়গায় প্রবেশ করতে দেয়, তাদের একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি জাগায়।
 
গাড়ির বাইরের দৃশ্যে পাহাড়ি, আঁকাবাঁকা রাস্তা, ধুলোবালি, এবং অনুর্বর ল্যান্ডস্কেপ দেখা যায়। এই বিস্তীর্ণ, শূন্য প্রকৃতি বাদিইয়ের অভ্যন্তরীণ শূন্যতার প্রতীক। প্রকৃতির নীরবতা, কেবল বাতাসের শব্দ এবং গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ—সবকিছু মিলে একটি অস্তিত্ববাদী পরিবেশ তৈরি করে।
 
রঙের ব্যবহারও তাৎপর্যপূর্ণ। পুরো সিনেমা জুড়ে মাটির রঙ, বাদামি, ধূসর প্রাধান্য পায়—যা মৃত্যু এবং নিস্প্রাণতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু শেষে যখন মেটা-সিকোয়েন্স আসে, তখন হঠাৎ সবুজ, উজ্জ্বল রঙের বিস্ফোরণ ঘটে—জীবনের প্রত্যাবর্তন।
 
গাড়ি এবং যাত্রা কিয়ারোস্তামির সিনেমায় বারবার ফিরে আসা মোটিফ। এখানে গাড়ি হলো জীবন যাত্রার প্রতীক, এবং প্রতিটি যাত্রী একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসে। বাদিই ড্রাইভিং সিটে আছেন—তিনি তার নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রক। কিন্তু তিনি একা, এবং এই একাকীত্বই তাকে ধ্বংস করছে।

 

সিনেমাটি অস্তিত্ববাদী দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আলবেয়ার কাম্যুর দ্য মিথ অফ সিসিফাস এর কথা মনে পড়ে—কাম্যু বলেছিলেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্ন হলো আত্মহত্যা। জীবন যদি অর্থহীন হয়, তাহলে বেঁচে থাকব কেন? কিয়ারোস্তামি এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর দেন না, কিন্তু বাঘেরির মাধ্যমে ইঙ্গিত করেন যে অর্থ তৈরি করতে হয় ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
 
শেষের মেটা-সিকোয়েন্স ব্রেখটিয়ান এলিয়েনেশন এফেক্ট তৈরি করে।মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে এটি সিনেমা, বাস্তব জীবন নয়। কিন্তু এর মাধ্যমে কিয়ারোস্তামি আরও বড় প্রশ্ন তোলেন : সিনেমা এবং জীবনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? দুটোই কি নির্মাণ নয়? বাদিই চরিত্র মারা গেছেন, কিন্তু এরশাদি অভিনেতা বেঁচে আছেন’, এবং সিগারেট খাচ্ছেন। মৃত্যু এবং জীবন, ফিকশন এবং রিয়েলিটি—সবকিছু আপেক্ষিক।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ