সাম্প্রতিক প্রকাশিত

10/recent/ticker-posts

কবি আক্তারুজ্জামান লেবু: না প্রয়াত না অনন্ত অন্ধকার ➣ রাহমান ওয়াহিদ

কবি আক্তারুজ্জামান লেবু: না প্রয়াত না অনন্ত অন্ধকার  রাহমান ওয়াহিদ

 

এক শীর্ণকায় কবি বসে আছেন অবারিত ধানী মাঠের এক কোণে। মাদুর পেতে। কোলের উপর পাতলা চাদর। পেছনে রোদের তীব্রতা এড়াতে দুটো পুরোনো কাঁথা ঝোলানো। তার নির্লিপ্ত চোখ দুটো কখনও সামনের উঁচু ভিটায় স্থিত টিনের চালার বাড়ির দিকে, কখনওবা নিজের শীর্ণ শরীরের দিকে। কখনও শোয়া থেকে উঠে পা মুড়িয়ে বসছেন, কখনওবা সামনে পাদুটো বাড়িয়ে দিয়ে বসে থাকার চেষ্টা। হাত পঞ্চাশেক দূর থেকে এমনটা দেখতে দেখতে আমরা যখন কবির কাছে পৌঁছুলাম তখন বেলা এগারোটার মতো। জানুয়ারীর  শীতের ঠান্ডা তখন অনেকটা পরাস্ত রোদ্রতাপের কাছে।
অসুস্থতায় পর্যুদস্ত কবি আমাদেরকে ঘোলা চোখে একটিবার দেখে খানিকটা অবাক হলেন, বিব্রতও হলেন বোধ হলো। একেবারেই হঠাৎ করে যাওয়া আমাদের। তাকে আগেভাগে না জানানোটা ছিল আমাদের পূর্ব পরিকল্পিত। গুরুতর অসুস্থ কবি আমাদেরকে সমাদর করানোর জন্য অযথা ব্যস্ত হয়ে পড়বেন সেটা না চাওয়া থেকেই তরুণ কবি হিরণ্য হারুন এর সাথে পরামর্শ করে এভাবে যাওয়া। কবি লেবুর বাড়ি থেকে একটা বড়সড় মাঠ পেরোলেই হারুন এর বাড়ি। বগুড়া থেকে আমরা মানে-অগ্রজ কবি ও প্রাবন্ধিক বজলুল করিম বাহার ভাই, কবি ও প্রাবন্ধিক শোয়েব শাহরিয়ার, অনুজপ্রতিম কবি ও প্রাবন্ধিক শিবলী মোকতাদির আর আমি। আমরা দেখতে গেছি গুরুতর অসুস্থ এক তরুণ কবিকে। গাইবান্ধার বেশ ভেতরের একটি গ্রামে। অনেকটা কোলাহলমুক্ত নিভৃত নিবিড় সবুজে ঢাকা গ্রাম। গ্রামটির শেষ প্রান্তে কিছুটা নীচু ভিটায় কবি বসে আছেন নির্লিপ্ত চোখে। এখনও তিনি যেন আমাদের চোখের সামনে দীপ্যমান, জীবন্ত এক মানুষ। একথাটি যেমন সত্য, তেমনি এ-ও সত্য যে-এ লেখাটি যখন লিখছি তখন তাঁর কায়িক উপস্থিতি আর আমাদের সামনে নেই। হ্যাঁ, আমরা দু’হাজার একুশ সালে প্রয়াত তরুণ কবি আক্তারুজ্জামান লেবুর কথাই বলছি। আমাদের ধরাছোঁয়ার একেবারে  বাইরে এখন তিনি। কিন্তু হৃদয় মননের বাইরে কি? অবশ্যই নন। কায়িকভাবে তিনি নেই বটে কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া বিশেষ করে খুব অল্প সময়ে লেখা তাঁর দুটি কবিতাগ্রন্থে তাঁর বিস্ময়কর কবিত্বের যে
স্ফুরণ আমরা দেখতে পাই, তা কবিকে মনে রাখবার মতো যথেষ্ট হৃদয়স্পর্শী অবশ্যই। এমন এক ক্ষণজন্মা কবিকে নিয়েই মূলত এই লেখাটির ভাবনা সূত্র। যদিও ব্যক্তি আক্তারুজ্জামান লেবুর কবিমানসের সাথে সম্যকভাবে পরিচিত হওয়ার কোন সুযোগ এখন আর নেই তবুও তাঁর কাব্যভাবনার অনেকটাই দেখা মেলে তাঁর দুটি কাব্য গ্রন্থেই, বিশেষ করে তাঁর দ্বিতীয় ও সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ’ এ। এটুকুই বা কম কী? তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘না জল না অনল’, আর দ্বিতীয়টি ‘দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ’। আমি দ্বিতীয়টিই বেছে নিয়েছি কবিকে নিবিড়ভাবে পাঠ করবার ইচ্ছে নিয়ে। অসুস্থতার কীট শরীরে ধারণ করে কত কষ্ট করেই না তিনি একটি একটি করে অক্ষর সাজিয়ে সমস্ত আবেগ,ভালোবাসা, বেদনা, অভিমান নিঙড়ে দিয়েছেন কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে! ভাবতে সত্যিই অবাক লাগে। তাঁর পংক্তিলোর দিকে চোখ রেখেই তাঁকে যতটা সম্ভব পড়বার, চিনবার একটা চেষ্টা থাকবে এ লেখায়। এর বেশি কিছু নয়।
 
আমরা কবির কাছে পৌঁছোবার পর কবিকে যেমনটা দেখলাম সে কথায় যাবার আগে খুব বলতে ইচ্ছে করছে যে-এ কেমন দেখা একজন কবির সাথে? প্রথম দেখা আর কী আশ্চর্য যে সেখানেই দেখার শেষ! দেখা হওয়ার পরেও আরো মাস দুয়েক প্রাণটিকে বুকে নিয়ে ছিলেন তিনি। কেন আমরা আরেকটিবার দেখতে যেতে পারলাম না তাঁকে? আমরাও কি ধরেই নিয়েছিলাম নিভু নিভু জীবনের সাথে কেনইবা দেখা আর? আশ্চর্য লাগে কবি নিজেও জীবনের এমন নিষ্ঠুর সীমাবদ্ধতার কথা বুঝে নিয়েছিলেন অনেক আগেই। তিনি যে প্রয়াত হবেন তা তিনি শুধু জানতেনই না,আত্মস্থও করে ফেলেছিলেন সচেতনভাবেই। জীবনীশক্তি খুব প্রবল না হলে নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করা খুব কঠিন। তাঁর ‘প্রয়াত’ শব্দটির ব্যবহারের মধ্যেই তাঁর এমন আত্মশক্তির আভাস মেলে। ‘প্রয়াত’ শব্দটির ব্যবচ্ছেদ করে তিনি নিজেই অকপটে বলেছেন,
মানুষ মরে গেলে লোকে কিছুদিন সদ্যপ্রয়াত বলে,
তারপর আর কিছু বলে না,
ভুলে যায়,আর
মৃত ব্যক্তি যাপন করতে থাকে অনন্ত অন্ধকার।’(বাস্তবতা)
কী বলবো আমরা জীবিতরা? বলবো কী যে ‘আপনি কবি। কবিরা সতত জীবন্ত?’ বলবো কী যে ‘আপনি ‘না প্রয়াত না অনন্ত অন্ধকার?’ মানবেন কি তিনি এ কথা? দৃশ্যান্তরে না গেলে শুকনো হাসি হেসে হয়ত বলতেন, ‘মানা, না মানায় কীইবা আসে যায়, বলুন। এ দেহটি যে থাকবে না এটিই তো বড় সত্য, নয় কি?’ সেজন্যেই কি তিনি আগেভাগেই বলেছেন,
মৃত্যু আসন্ন হতেই পারে, মানুষ কি চিরকাল বাঁচে? কে বাঁচে শুনি?’(মানুষ)
 
লড়াকু কবি আক্তারুজ্জামান লেবু দুরারোগ্য ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে করতে এভাবেই লিখে গেছেন পংক্তির পর পঙ্‌ক্তি। লড়াই এ তিনি কখনও থেমে যাননি। পরাজয় মানেননি, চিকিৎসার শেষ প্রান্তটি পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছেন শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত।  কিন্তু দানবীয় মৃত্যুর শক্ত হাত থেকে বাঁচতে কেউবা পারে। পেরে উঠলেন না ক্লান্ত কবিও। অমোঘ মৃত্যুর থাবায় বন্দী হয়ে চলে গেলেন তিনি ওপারের নিস্তব্ধ শূন্যতায়। একুশে মার্চের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে আমরা হারালাম মাত্র আটাশ বছরের এক নক্ষত্র কবিকে। বলতেই পারি অনেকটা উনিশ বছরের সদ্য তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো হঠাৎ জ্বলে উঠেই নিভে যাওয়ার মতো কবি আক্তারুজ্জামান লেবুও।
 
তাঁর সাথে এর আগে কোন পরিচয় ছিল না আমার। অনেক দূরে অবস্থানের কারণে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কবি শিবলী মোকতাদিরের মুখ থেকেই প্রথম জেনেছিলাম অসুস্থ এই কবির চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে কবির নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সহায় সম্পদের অনেকটাই তখন নিঃশেষ। এদিকে চিকিৎসকরাও তেমন আশা দেখাতে পারছিলেন না। কিন্তু আশা ছাড়েননি লড়াকু কবি। বেদনার্ত হয়ে তবু বলেছেন,
তবু ইচ্ছে হয়, যদি আরেকটা হেমন্ত
কাটানো যেত সকালের উঠোনে,
আরেকটা শীত,পাওয়া যেতো ঘাসের ওমে
কুয়াশা স্পর্শ করার মতো একটা মুহূর্ত...(ইচ্ছেগুলো)
শিবলী তখন জানালেন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘না জল না অনল’ প্রকাশ করে বইটি বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টার কথা। নামি দামি কবি না হলে এমনিতেই সাধারণত কেউ কবিতার বই কিনতে চায় না, সেখানে নতুন এক কবির প্রথম কবিতা গ্রন্থ তেমন কেউ কিনবে বলে প্রাথমিক বিবেচনায় আমার মনে হয়নি। কিন্তু শিবলী তাঁর অসীম সহমর্মিতা নিয়ে পরিচিত কবি লেখকদের অসুস্থ কবির প্রতি সহানুভূতি আকর্ষণ করতে যেভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তা সত্যিই অবাক করার মতো। তাঁর সেই চেষ্টার ফলে খ্যাত অখ্যাত অনেকেই সাগ্রহে কবির বই নিয়ে সাহায্যের অকুণ্ঠ হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মিলেছে আশাতীত পরিমাণ অর্থ। তবে অর্থের চেয়েও আমার কাছে বড় মনে হয়েছে একজন মুমূর্ষু কবির জন্য বেশকিছু মানুষের আকাশহৃদয় ভালোবাসা, যা সত্যিই এ সময়ে বড়ই বিরল।
 
তো এবার ফিরে আসি কবির সাথে প্রথম দেখা হওয়ার কথায়। আমাদের চার জোড়া বিনম্র চোখ তার নমিত মুখের উপর। ভেতরের তীব্র ব্যথা নিয়েও একটু স্বস্তি খুঁজছিলেন তিনি কিছু বলার চেষ্টায়। কিন্তু পারছিলেন না। শিবলী ছাড়া আমরা তিনজনই তাঁর কাছে নতুন মুখ। নাম জানতেন কিন্তু দেখেননি কখনও। সেজন্যে একটু অস্বস্তি হওয়ারই কথা। না জানিয়ে এভাবে তাঁকে দেখতে আসার জন্য মৃদু অনুযোগ করলেন কবি মৃদুস্বরে। আমরা বুঝিয়ে বলাতে সম্ভবত শান্ত হলেন। তিনি তাঁর সদ্য প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ’ আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন। বইটির পাতা উল্টোতে উল্টোতে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে যাই মন ছুঁয়ে যাওয়া কিছু কবিতার উপমা ও ধ্বনি ব্যঞ্জনার কারুকাজ ও শক্তিময়তা দেখে। ততক্ষণে বিস্ময় ও বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া সত্তরোর্ধ্ব বাহার ভাই অপলক চোখে তাকিয়ে দেখছেন তীব্র ব্যথাকে অগ্রাহ্য করে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে থাকা সাহসী কবিকে। কবি শোয়েব ভাই তখন দরদমাখা কণ্ঠে আবৃত্তি করে চলেছেন কবির একের পর এক কবিতা। তাঁর মুখে আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি যেন কবিরই অমিয় কণ্ঠস্বর
মৃত্যু এখন আমার সবচেয়ে কাছের কেউ, তাকে আদর করি দিনরাত।
তার কোলে আমার স্মৃতিগুলো তুলে দেই আঁজলা করে
দুঃখগুলোকে তার বুকের কাছে রাখি
অদ্ভুত সাহসে কাঁধে রাখি হাত।’ (দেখানো হলো না)
 
নিশ্চিত মৃত্যুকে এভাবে আলিঙ্গন করার পরেও পৃথিবীতে থেকে যাওয়া মানুষদের সান্ত্বনা দিতে ভোলেননি কবি।
আমার না থাকার জন্য দুঃখ করো না শালিক..
 
 
পৃথিবীর কোনো কবি আমাকে পড়েনি, খোলেনি পাতা
কোকিলের কণ্ঠস্বরে রেখে গেলাম যত অভিযোগ
তোমাদের ভাষায় অনুবাদ করে পড়ে নিও।’
( দুঃখ করো না )
আসলেই সত্যি যে কবিকে আমাদের তেমন করে পড়া হয়ে ওঠেনি। সেই সুযোগও আমরা পেলাম না। অথচ তাঁর এইসব কবিতা পড়তে পড়তে কখনও মনেও হয় না কবি সদ্য তাঁর কবিতার নতুন পাতাটি খুলেছেন। তাঁকে পড়তে না পারার যে অভিমান তিনি রেখে গেছেন, তার অনেকটাই কেটে যায় তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থের সাক্ষাৎ পেয়ে। তাঁর ভেতরে দৃষ্টিপাত করে আমরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করতে পারি বড় মাপের এক কবির সত্তাকে। প্রকৃতির সমুদ্র দেখতে না পারার আফসোস ছিল তাঁর। কিন্তু তিনি জেনে যেতে পারলেন না কবিতার বিশাল সমুদ্র কতটাই না ধারণ করেছিল তাঁকে।
নিঃসংশয়ে ডুব দিতে পেরেছিলেন তিনি সেখানে। সেখান থেকে তিনি মুক্তাসহ ঝিনুক কুড়িয়ে আনতে পারতেন, কি পারতেন না সে প্রশ্নে না গিয়েও নিঃসংশয়ে বলা যায়
আক্তারুজ্জামান লেবু অপার সম্ভাবনা নিয়ে কবিতার ভিন্ন কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার প্রস্তুতি পর্ব অতিক্রম করছিলেন। অমোঘ মৃত্যু এসে তাকে আচমকা থামিয়ে দিল বটে কিন্তু তার আগেই নিজের কোমল অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বরের বৈচিত্র্যময় ধ্বনি ব্যঞ্জনা অপরিমেয় শক্তিতে কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে গেঁথে দিয়ে গেছেন তিনি।  যে অল্প কিছু কবিতা লিখে আমাদের মন ও মননকে যে দারুণভাবে স্পর্শ করতে পেরেছেন, তাঁর প্রতি আমাদেরকে আগ্রহী করে তুলতে পেরেছেন এটি ভালো কবিতার আকালের এই দুঃসময়ে অবশ্যই বড় কিছু। আর সেজন্যেই তাঁর সমসাময়িক কবিদের লেখা থেকে তাঁকে নিঃসন্দেহে আলাদা করা যায়।
 
আসন্ন মৃত্যুর দানবীয় হাতছানিকে সামনে রেখে তাঁর ভেতরে কি শুধু গাঢ় বিষণ্নতা আর অভিমান কাজ করেছে? তারুণ্যের হৃদয়মথিত প্রেম কি তাঁকে স্পর্শ করেনি? অবশ্যই করেছে। অদৃশ্য দয়িতার জন্য তাঁর আবেগমাখা কণ্ঠটি এরকম
এই যে তুমি পরম যত্নে বুকের কাছে বই নিয়ে হাঁটো
ষোড়শী
এজন্য তো আমি বই হয়ে জন্মাতে চেয়েছিলাম।’
 (অকবিতা)
আরেক জায়গায় কবি দয়িতাকে বলছেন
এই যে আমার চোখের ওপর তোমার চোখ দুটো রেখে পালালে
তোমার চোখ নিয়ে এখন আমি কোথায় পালাবো
আমার তো সব পথ বেঁকে গেছে সমুদ্রে!’
(অকবিতা)
দয়িতার জন্য তাঁর অভিমানও কম ছিল না। বলেছেন
একদিন তোমার বাড়ির রাস্তায় আর দাঁড়াবো না
রাস্তায় শূন্যতার অবাধ যাতায়াত হবে তখন...
তোমাকে কেউ বলবে না লাল ওড়নাটা পরে
একটু বারান্দায় এসে দাঁড়াও তো,আর
মাছ কাটছি বলে অজুহাতও তোমায় দেখাতে হবে না’ (ভবিতব্য)
 
তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়-প্রেমের অধিক দুষ্পাঠ্য ছিল তাঁর বাবার দুটি
চোখ। বাবার জন্য তাঁর ভালোবাসা আর বেদনা যুগপৎ আমাদের বিস্মিত ও আর্দ্র না করে পারে না। বাবাকে নিয়ে নিঃসংকোচে বলেছেন তিনি
বাবাকে বেচে খেয়েছি অনেকদিন
তার দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ আর অসহায় দুপুরগুলোকে
আমি আর কারো কাছে বেচবো না ভেবে চুপ করে থাকি।
বাবার রক্তে ভেজা উপার্জনে আমি পড়তে শিখেছিলাম ঠিকই
একটা ভালো চাকরির আশায়
একগাদা সার্টিফিকেটও বাগাতে পেরেছি
কিন্তু বেঁচে থাকতে তাঁকেই আর পড়া হলো না আমার। (দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ-১-২)
 
আবারো ফিরে আসি কবির সান্নিধ্যে যাওয়ার কথায়। বেলা বাড়ছে। শোয়েব ভাই কবিতা পাঠ শেষ করেছেন। তখন মনে হচ্ছিল-সময় যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে। আমাদের চোখগুলোর বাইরে বা ভেতরে আর্দ্রতায় ভিজে গেছে তখন অনেকটাই। মুখের শব্দ বা ভাষা অনেকটাই তখন নির্মোক,অসহায়। তারপরও থমকে দাঁড়ানো সময় একসময় বইতে শুরু করে।  আমাদের তাড়া দেয়। আমাদের চলে যাবার সময় হয়ে আসে। কবি তখনও নীরবে অচঞ্চল চোখ দুটোকে কোলের উপরে স্থির করে রেখেছেন। ভেতরের কষ্টকর যন্ত্রণাকে ঠেকিয়ে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা তখনও করে চলেছেন তিনি। অসাড় অনুভূতিতে আচ্ছন্ন ও  নৈঃশব্দ্যের আড়ালে মুহ্যমান আমাদের  যে কোন সান্ত্বনাই এখন অর্থহীন। কবি নিজেও তা জানতেন। তাঁর এই সমুদ্রকষ্ট শেয়ার করার মতো না। সেজন্যেই কি তিনি নিজের সাথেই কষ্টটি এভাবে শেয়ার করেছেন?                  
        ‘নিজের জন্য একদিন কাঁদতে বসবো
         নিজেকে সামনে বসিয়ে রেখে খানিক কেঁদে নেবো
         নিজের কাঁধে রাখবো হাত। গুছিয়ে দেবো চুল
         নিজেকে একবার জড়িয়ে নেবো বুকের সাথে
         নিজের চোখে চোখ রেখে মিথ্যে ভরসাও দেবো
        তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে একা ফেলে রেখে
        চলে যাবো বহুদূর...(নিজের সাথে একদিন)
কবি তাঁর চলে যাবার মতো, বুক ভেঙে দেয়ার মতো কথাটি রেখেছেনও। কোনো বাঁধনই তাঁকে আর আটকে রাখতে পারেনি। কবির কাছ থেকে উঠে আসবার আগে অনেক কষ্টে আমাকে দেয়া তাঁর বইটির এক পাতায় লিখেছিলেন, ‘রাহমান ওয়াহিদ ভাই, কৃতজ্ঞতা জানবেন, দোয়া করবেনআক্তারুজ্জামান লেবু’। একথা যখন লিখছি তখন তাঁর হাতের এই ছোট্ট ছোট্ট অক্ষরগুলোই এখন আমার চোখের সামনে, যেন কথা বলছে অস্ফুট বিনম্র ভাষায়। সবুজ কালিতে লেখা অক্ষরগুলো কি দারুণ তরতাজা! অথচ কবি নেই। এই অমোঘ সত্যটি মেনে নেয়া কষ্টকর। কিন্তু একসময়
তো তা মানতেই হয়। কিন্তু শেষ করবার আগে আবারো বলি কবি কি কখনও প্রয়াত হন? তাঁর রেখে যাওয়া বিস্ময়কর সৃষ্টির মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। 
তিনি দৃশ্যত নেই
, হয়তোবা তিনি এখন কবরের উপর কেবলই সবুজ তাজা ঘাস।...তবু তিনি থাকবেন কবিতা প্রিয় মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে, যেখানে তাঁর অনন্ত বসবাস। অনন্ত অন্ধকার অবশ্যই নন তিনি। ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় কবি। খুব ভালো থাকুন । 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ