কবি-প্রাবন্ধিক খৈয়াম কাদের
কবির যুদ্ধ
কবিতার যুদ্ধ
‘বরং
নিজেই তুমি লেখ নাকো একটি কবিতা
বলিলাম ম্লান
হেসে— ছায়াপিণ্ড দিল না উত্তর
বুঝিলাম সে তো
কবি নয়— সে যে আরূঢ় ভণিতা:
পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ’পর
বসে আছে
সিংহাসনে— কবি নয়-অজর অক্ষর
অধ্যাপক-দাঁত
নেই— চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি;
বেতন হাজার টাকা
মাসে-আর হাজার দেড়েক
পাওয়া যায় মৃত
সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি;
যদিও সে সব কবি
ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক
চেয়েছিল— হাঙরের ঢেউয়ে খেয়েছিল লুটোপুটি।’
[সমারূঢ়:
সাতটি তারার তিমির: জীবনানন্দ দাশ]
কবি-চিত্তের এই
সংক্ষোভাক্রান্ত অভিব্যক্তিই তো কবিতার পথ-পরিক্রমায় অনন্ত যুদ্ধের নজির। কবিকে
যুদ্ধ করেই এগিয়ে যেতে হয় কবিতার পথে; রক্ষা করতে হয় কবিতার সার্বভৌমত্ব, অধিস্বত্ব
এবং অধিবাস। উদ্ধৃত কবিতার ভাব ও ভাষা থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে অজর অক্ষর
অকবি অধ্যাপক ও পণ্ডিতকুল চিরকালই তাঁদের সমকালের সৃষ্টিশীল কবিদেরকে উপহাস ও
উপেক্ষা করেন, তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করেন। এঁরা জীবননিষ্ট
শিল্প-ভাস্কর কবিদের প্রতিপক্ষ, শত্রুপক্ষ। এসব তথাকথিত
তাত্ত্বিক বোদ্ধা ও প্রাজ্ঞরা পূর্বকালের মৃত কবিদের পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য ও টীকা খুঁটে এবং কুটে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করলেও পার্শ্বজন
কবিদের প্রতি পোষণ করেন হীনম্মন্যতা জনিতা ঈর্ষা। আবার সাহিত্য জগতের সারথি হওয়ার
দাবিদার এক শ্রেণির কবি, লেখক, সমালোচক
ও সম্পাদকও জাত কবিদের যাতনার কারণ হয়ে থাকেন। এঁরা মৌলিক প্রতিভায় অনুসিক্ত
শক্তিমান শিল্প-স্রষ্টাদের উচ্চকীয়তা অনুধাবনে অক্ষম। তাই প্রকৃত কবিদের
সৃষ্টিকর্মগুলিকে হয় এঁরা ইগনোর করেন নয়তো সেসব নিয়ে নানা রকম নেতিবাচক ও
নিন্দাসূচক কথা ব’লে নিজেদের ক্ষীণতা, শীর্ণতা ও দীনতা
ঢাকার প্রয়াস পান; যেমন- বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বৃহত্তর
বৃটিশ-বাংলার রাজধানী কলকাতার সাহিত্য অঙ্গনে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার স্বনামধন্য
সম্পাদক শ্রী সজনীকান্ত দাস এবং সুরেশ সমাজপতিসহ সময়ের আরো কিছু পরিচিত
কবি-সাহিত্যিক বাঙালির জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও রূপসী বাংলার শুদ্ধতম কবি
জীবনানন্দ দাশকে নানাভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। তাঁদের কাব্য-সাহিত্যের
অন্তশাঁসকে অন্তঃসারশূন্য প্রমাণ করার লক্ষ্যে এন্তার কসরত চালিয়েছেন কাগজের পাতায়
ও মুখের কথায়। এমনকি কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত বিব্রত করতে ছাড়েননি। একইভাবে
ইংল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কবি John Keats- এর
অপূর্ব শব্দশৈলী এবং ভাব ও ধ্বনি-ব্যঞ্জনার সৌন্দর্যে পরিমণ্ডিত কবিতা নিয়েও
বীভৎস নিন্দাচারে ব্যাপৃত ছিল সেকালের Tory Reviewers নামের
এক ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা। এই সব প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা
ও পরশ্রীকাতরতার সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে অগ্রধাবি হতে হয় কবিকে,
কবিদেরকে। সুতরাং কবিতা-পথের পরিভ্রমণ ও পরিব্রাজন মোটেও মসৃণ
নয়, অসংকুল নয়; বরং বড়ই বন্ধুর ও
বিড়ম্বনাময়। কবি-খ্যাতি ও কাব্য-শিল্পের গন্তব্য ভীষণ বিরূপতায় আবিষ্ট এবং অতিশয়
দূরান্বয়ী ও দুর্গম। কারণ কবিরা চিরকালই নিঃসঙ্গ এবং স্বার্থবাদী শক্তি-বলয়ের কাছে
তাঁরা অবহেলিত এবং উপেক্ষিত।
জাগতিক জীবনে
সংঘটিত সব রকমের অনাচার, অবিচার
ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সদা সচেতন ও জাগ্রত থাকে কবিদের সংবেদনশীল মন ও মানস। তাঁরা
সত্যের সাধক, সৌন্দর্যের পূজারি; তাঁদের চিত্ত সতত বিচলিত হয় জীবনের বঞ্চনা, লাঞ্ছনা
ও যন্ত্রণা দেখে। তখন তাঁরা তাঁদের মননের সবটুকু নির্যাস ঢেলে মূকের জবানিতে
মুখরিত করেন মুক্তির গান, দৃপ্ত বাণীর বাণে সহসা ঘটাতে
চান অপশক্তির অবসান, নির্মাণ করতে চান শোষণ, প্রেষণ ও বৈষম্যমুক্ত প্রেমময় এক মানবিক বিশ্ব। আর তখনই কবি-কল্পের
সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের দানবীয় শক্তি নিচয়। কবির
কণ্ঠকে তারা স্তব্ধ করতে চায়, অবরুদ্ধ করতে চায়।
নিশ্চিহ্ন করতে চায় তাঁদের স্বপ্ন-সৌন্দর্যের মানবীয় প্রয়াসগুলি। সম্ভবত এমন
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই নাইজেরিয়ার নোবেল জয়ী সাহিত্য ব্যক্তিত্ব Wole
Soyinka বলেছেন- ‘Books and all sorts of writing are
terror to those who wish to suppress the truth’ তিনি আরো
বলেছেন- ‘Power is domination, control, and therefore a very selective
form of truth which is a lie.’ কবি-সাহিত্যিক ও বিশুদ্ধ
চিন্তকদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির নানামুখী নির্যাতনের নমুনা স্বরূপ বলা যায়- King
Richard-ii-এর সমালোচনা করার অপরাধে চিরতরে হারিয়ে যান England
-এর ১৪ শতকের তুখোড় প্রতিভাধর কবি, অমর
কাব্য ‘Piers the Plowman’-এর রচয়িতা William
Langland. কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে দুঃসহ যন্ত্রণায় গোঙাতে
হয় বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা মহাকবি ‘Paradise Lost’ ও
‘Paradise Regained’-এর স্রষ্টা John Milton -কে। বিশ্বাস ও চিন্তার স্বাধীনতা দাবি করায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত
হতে হয় প্রগতির প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত কবি পি. বি. শেলীকে। বর্বর রুশ-সম্রাট
নিকোলাসের দণ্ডাজ্ঞায় সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হন শতাধিক প্রতিভাদীপ্ত কবি; ফাঁসির রজ্জুতে লট্কে থাকে জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি পুশকিনের মৃহদেহ।
সারা দুনিয়ায় নন্দিত বোধ-মননের মহান কবি পাবলো নেরুদার ঠাঁই মেলেনি তাঁর স্বদেশ
‘চিলির’ মাটিতে। নাইজেরিয়ার আরেক জীবনবাদী কবি Chris Abani -কে ছাড়তে হয় তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি। ‘এ দেশ ছাড়বি কিনা বল নইলে কিলের
চোটে হাড় করিব জল’ উচ্চারণের মুক্তিকামী কণ্ঠস্বর বঙ্গজনতার প্রাণের কবি কাজী
নজরুল ইসলামকে খাটতে হয় জেল; কয়েদ-খানার অন্ধঘরে পালন
করতে হয় দীর্ঘতম অনশন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের জেল-জুলুমের শিকার হতে হয় বাংলার
পল্লীকবি জসীম উদ্দীনকে। বৃটিশ-ভারতের জালিয়ান ওয়ালাবাগে পরিচালিত অমানবিক
নির্যাতনের প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুরকে ঘৃণাভরে প্রত্যর্পণ করতে হয়
বৃটিশরাজের নাইট উপাধি। ‘শুনো হে মানুষ ভাই, সবার উপরে
মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ প্রভাষণের মানবতাবাদী প্রবক্তা বাংলা সাহিত্যের
প্রাচীন কবি চণ্ডীদাসকে জান্তব নির্যাতনে বরণ করতে হয় নিষ্ঠুর মরণ। হালকালে
পশ্চিমবঙ্গের দলিত লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারীকে দীর্ঘকাল বইয়ে বেড়াতে হয় দুর্বিষহ
কষ্টের জীবন। গ্রিক দর্শনের প্রথম বর্তিকা সক্রেটিস কবি ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন কবিদের ধ্যানক্ষেত্র সত্যান্বেষার দিগদিশারী,
জ্ঞানান্বেষার মগ্ন সাধক। কবিদের জ্ঞাতি জাতক মহান এই
সত্য-সাধককে রাজঈর্ষার কবলে পড়ে প্রাণ হারাতে হয় ভয়ংকর বিষ হেমলক পানে। এসব
বহির্যাতনার পাশাপাশি কবিদেরকে ব্যাপক আত্মদহনের যন্ত্রণাও সইতে এবং বইতে হয়। কারণ
অন্তর্গত এক অদৃশ্য তাড়নার বশবর্তী হয়ে তাঁরা অজানাকে জানতে চান, রহস্যাবৃত গোপন সত্যকে উদ্ঘাটন করতে চান। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশের
প্রখ্যাত ফরাসি কবি আতুর্র ব্যাঁবোর (Arthur Rimbaud) মতে
‘সমস্ত মানুষের মধ্যে কবি হচ্ছেন সবচেয়ে অত্যাচারিত, সবচেয়ে
বড় অপরাধী, অভিশপ্ত, আবার
মহাজ্ঞানী, কেননা তিনি অজানার সমুখে দণ্ডায়মান।’ এমনতর
বিচিত্রমুখী প্রতিবন্ধকতা ও নির্যাতন-নিষ্পেষণের বন্ধুর পথ পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয়
কবিকে, কবির জ্ঞাতিকে; জাগ্রত
রাখতে হয় কাব্যশিল্পের নন্দন-চারু এবং জৈবনিক ভাবদর্শন ও মানবীয় প্রত্যয়ের প্রগাঢ়
অন্তর্চেতনা। জানা যায় প্লেটোর গুরু সক্রেটিসও মৃত্যুপূর্ব জেল জীবনে কবি ও কবিতা
নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু প্লেটো সে পথে না গিয়ে তাঁর প্রস্তাবিত আদর্শ
রাষ্ট্র থেকে বরং কবিদেরকে নির্বাসিত করলেন। কবি ও কবিতার বিরুদ্ধে আনিত তাঁর
অভিযোগগুলি হলো- কবিতা চর্চার মাধ্যমে মানুষের মূল্যবান কর্মসময় বিনষ্ট হয়,
কবিতা সকল মিথ্যাচারের জননী, কবিতা মানব
মনে কামুকতানিষ্ট দুষ্টু আবেশ সৃষ্টি করে, এবং কবিতা
মানুষকে কর্মবিমুখ ও অলস ক’রে তোলে। অন্যদিকে Stephen Gosson -তো কবিদেরকে ‘enemies to virtue’ বলেই অভিহিত
করেছেন। খ্যাতির শীর্ষে অবস্থানকারী আধুনিক বাঙালি কবি ও কাব্যালোচকদের মধ্যে
অন্যতম শ্রদ্ধেয় বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘কবিতার শত্রু ও মিত্র’ পুস্তিকায় প্লেটো,
রুশো, সেন্ট অগাস্টিন এবং টলস্টয়ের
কাব্য বিরোধী মনোভাব নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে টলস্টয়
জগতের সকল শিল্পকে ‘মিথ্যা শিল্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং নিজের সৃষ্টিকে
বলেছেন ‘কুশিল্প’। আর বিদগ্ধ পণ্ডিত শিবনারায়ণ রায় তাঁর ‘কবির নির্বাসন’ শীর্ষক
প্রবন্ধে প্লেটোর কাব্যবিরোধিতাকে খানিকটা আশকারা দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি
স্বীকার করেছেন যে প্লেটো তাঁর প্রথম জীবনে ছিলেন একজন কবি। তবে আমাদের জন্য আশার
কথা এই যে প্লেটোর নিজেরই শিষ্য সর্বকালের সর্বসেরা তত্ত্বচিন্তক Aristotle
এসে সুদৃঢ় যুক্তি উপস্থাপনার মাধ্যমে কবি ও কবিতাকে উদ্ধার করলেন
সেই নির্মম নির্বাসন থেকে। আরেক দিকে তাঁর অনেক পরে আধুনিক কালের ইংরেজ কবি ও
কাব্যতাত্ত্বিক Philip Sidney যথাযথ জবাবের মাধ্যমে কবিতা
সংক্রান্ত সকল অভিযোগ খণ্ডন করলেন এবং খোদ Plato -কেও
তিনি সম্বোধন করলেন একজন জাত কবি হিসেবে। তিনি বললেন- ‘Plato himself was
a born poet, and a large part of his Dialogues is poetic. In his Ion, he gives
high and rightly divine commendation unto poetry.’
কবিতা প্রসঙ্গে
ধর্মের দিকে তাকালে দেখা যায় ইসলামের ঐশী গ্রন্থ পবিত্র কোরআনের ‘শো অর’ (কবিগণ)
নামীয় সূরার ২২১ থেকে ২২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘(শয়তানের উক্তিতে) তাহারা
কর্মস্থাপন করে এবং তাহাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী এবং কবি, বিপথগামী লোকেরা তাহাদের অনুসরণ করে। তুমি কি
দেখ নাই যে নিশ্চয় তাহারা প্রত্যেক প্রান্তরে ঘুরিয়া বেড়ায় এবং যাহা করে না তাহারা
তাহা বলে।’ উল্লেখ্য সুরাটির শিরোনাম ‘কবিগণ’ হলেও এতে মাত্র একবারই কবিবিরোধী
কথা বলা হয়েছে এবং পুরো কোরআন শরীফের অন্য কোথাও আর এমন উক্তি পাওয়া যায় না।
তবে একটি হাদিসে নবি (সা.) বলেছেন- ‘কোনো লোকের পেট মিথ্যা কবিতার দ্বারা
পরিপূর্ণ হওয়া অপেক্ষা উহা পূঁজে পরিণত হওয়া অনেক ভাল যাহা উদর বা পেটকে নষ্ট
করিয়া ফেলে।’ কিন্তু ইতিহাস থেকে জানা যায় পরবর্তীতে তিনি নিজেও কবিতা শুনতেন এবং
ইসলামের পক্ষে কবিতা লেখার জন্য কবিদেরকে উৎসাহ প্রদান করতেন। তাহলে বুঝা যাচ্ছে
কোরআন শরীফে কবিবিরোধী যে একক বক্তব্যটি এসেছে তা শুধু ইসলাম ও নবীর নামে কুৎসা
রটনাকারী কবিদের উদ্দেশ্যেই উচ্চারিত হয়েছে। তবে একথাও সত্য যে সেই সময়ের আরবরা
ইসলামের প্রতি অতিমাত্রায় নিমগ্ন হয়ে পড়ায় তাদের কাব্যচর্চার প্রাচীন ঐতিহ্যটি তার
জৌলুস হারিয়ে ফেলে। যেমন জনসমাবেশে কবিতা পাঠ ও
বিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা সেসব কবিতার মান মূল্যায়ন সংক্রান্ত ‘উকাজের কবিতা মেলা’
এবং কাবা ঘরের দেয়ালে কবিতা ঝুলানোর রেওয়াজটি তখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
কবিকে তাঁর নিজ
গৃহেও লিপ্ত হতে হয় কবিতা যাপনের যুদ্ধে। কবিরা বহেমিয়ান, উদাসীন এবং উড়নচণ্ডী, এমনকি
দায়িত্বজ্ঞানহীন-এমনটাই মনে করে যুগযুগান্তের প্রথাবদ্ধ সমাজ ও সংসার। কাব্যচর্চার
বিনিময়ে কবির সংসার-চাহিদার কোনো পণ্য মেলে না, মেটে না
কবি পরিবারের সদস্যদের বিলাস ও বিনোদনের সাধ। তাই কবির প্রতি অনেক ক্ষেত্রেই চরম
ক্ষুব্ধ থাকেন কবির স্পাউজ এবং সন্তান-সন্ততিসহ অপরাপর আপনজনেরা। বিষয়ী ভাবনায় সবল
এবং চালাক ও বুদ্ধিমান লোকেরা, এমনকি কোনো কোনো
জ্ঞানদীপ্ত বড় বিদ্বান ও তথাকথিত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরাও, কবিকে-
‘ওহ্ উনি তো আবার কবি, কি হে কবি, কী খবর কবি সাহেব’ ইত্যাকার শ্লেষাত্মক অভিধায় সম্বোধন ক’রে এক ধরনের
বিকৃত আনন্দ লাভ করেন। অনুমান করা যায়, হয়ত এসব কারণেই
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো গুণী সাহিত্যিকও আক্ষেপ ক’রে বলেছেন- ‘দু’টো
ডালভাতের ব্যবস্থা না ক’রে সাহিত্য চর্চায় হাত দেয়া ঠিক নয়।’ বাংলা সাহিত্যের
কিংবদন্তি কবি জীবনানন্দ দাশ নিখিল বাংলার কাব্যপ্রেমীদের কাছে আজ যতটা প্রিয়
জীবতকালে এর চেয়ে অধিক অপ্রিয় ছিলেন নিজের স্ত্রীর কাছে। কলেজ শিক্ষকতার পেশাতেও
তিনি স্থিতি লাভ করতে সক্ষম হননি। তাঁকে একের পর এক বদলাতে হয়েছে কর্মস্থল। কারণ
সম্ভবত এই ছিল যে তিনি কূটবুদ্ধি সম্পন্ন কর্তৃপক্ষ এবং স্বার্থবাদী সহকর্মীদের মন
যোগাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরম ভালোবাসার চাকা ফিরে আসার অপেক্ষায় চরম নিঃসঙ্গতায়
জীবন কাটাতে হয়েছে বোধি বপনের কবি বিনয় মজুমদারকে। জনহীন ঘরের অন্ধকার কোণে
একাকী মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে দরাজদিল প্রেমিক কবি আনোয়ার আহম্মদকে। কথিত আছে প্রায়
আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মাথায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তাঁর
ক্ষিপ্ত স্ত্রীর হাতের গরম জল।
কবিদের বিরুদ্ধে
এই যে এতো এতো অভিযোগ-অপবাদ, তাঁদের চলার পথে এতো যে প্রতিরোধ-প্রতিবন্ধকতা তা সত্ত্বেও তারা থেমে
যাননি, অবনমিত বা অবদমিত হননি। বড় পদ, সম্পদ ও প্রতিপত্তির রঙিন পালকধারী মানুষদের ভ্রুকুটিকে আমলে নেননি
আদৌ। ‘শাহনামার’ কবি ফেরদৌসী মাথা নোয়াননি দিগ্বিজয়ী বীর গজনীর বাদশা সুলতান মাহমুদের
কাছে। বরং আত্মচেতনাস্থিত মানবিক দায়বোধে তাড়িত হয়ে পৃথিবীর সকল মহৎ কবি অবিরাম
এগিয়ে চলেছেন কল্পনাসৃত সত্য এবং আদর্শের পথে, সৌন্দর্যঋদ্ধ
শিল্প সৃষ্টির পথে। সভ্যতার সড়কপথ সাক্ষী, অনেক অনেক
নিন্দুকের বিপরীতে কবিদের জন্য অসংখ্য অভিনন্দন ও প্রশংসাকারীও আবির্ভূত হয়েছেন
সকল যুগে। মানব সমাজ অতিশয় হৃষ্টচিত্তে স্বাগত জানিয়েছে কবিদেরকে, কবিদের কবিতাকে। প্রাচীন কালের রোমান ও গ্রিকরা কবিদেরকে Vates
উপাধিতে ভূষিত করেছেন যার অর্থ Seer বা Prophet.
এই ধারণার সূত্র ধরেই তারা কবিদেরকে বলতেন ‘Father of
learning’. ইংল্যান্ডের আধুনিক কবি ও কাব্যবিদ Mathew
Arnold বলেছেন- ‘Poetry is a criticism of life "
and ‘Poetry is an application of ideas to life.’ আর রোমান্টিক
যুগের প্রধান কবি William Wordsworth মনে করেন- ‘Poetry
is the breath and spirit of all knowledge.’ সবশেষে বলা যায়
কবিরা পার্থিব জীবন সমগ্রের সদর্থক ভাষ্যকার, ভাস্কর ও
উপস্থাপক। অন্য কথায় কবিতা মানুষের মন, মনন, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার চিত্র-বয়ান। এই শিল্প মানুষের চিত্তগত অবসাদ
তাড়ানোর টনিক, সত্য জানার সিঁড়ি, এবং প্রেম ও ভালোবাসার কল্লোল ধারা। কবিতার ভেতরে নিহিত থাকে জৈবনিক
গতির মন্ত্র, অজানাকে জানার এষণা। সুতরাং বিশ্বসভ্যতার
অগ্রাভিগমনের সুদীর্ঘ যুদ্ধযাত্রায় কবিরাই সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা এবং চূড়ান্ত
বিজেতাও তাঁরাই।
সেপ্টেম্বর, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ
তথ্যসূত্র:
i. Sidney’s ‘An
Apology for Poetry’
Dr.
Raghukul Tilak
Rama
Brothers
Bank
street, Karol Bagh
New
Delhi-110005, Sixth Edition-1988
ii. Mathew
Arnold: The Study of Poetry
Ramji
Lall: Aaroti Book Center
New
Delhi-8: Eighteenth Edition-2000
iii. John
Milton: Paradise Book-1
Aarote
Book Center
New
Delhi-8
Nineth
Edition-1979
iv. John Keats:
Selected Poems
Dr.
S. Sen
Unique
Publishers
Lajpat
Nagare, New Delhi-110024
v. কবিতা যখন অভিযুক্ত: মাশুক চৌধুরী
নতুন দিগন্ত: সপ্তদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০০৯
vi. ভূমিকা
: পরাবাস্তব কবিতা
আবদুল মান্নান সৈয়দ
vii. ইন্টারনেট
vii. কাজী
নজরুল ইসলাম/বর্তমান বিশ্বসাহিত্য
প্রবন্ধ সংগ্রহ/ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়/ ১৯৯২, পৃষ্ঠা-২৫১
‘বরং
নিজেই তুমি লেখ নাকো একটি কবিতা
বলিলাম ম্লান
হেসে— ছায়াপিণ্ড দিল না উত্তর
বুঝিলাম সে তো
কবি নয়— সে যে আরূঢ় ভণিতা:
পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ’পর
বসে আছে
সিংহাসনে— কবি নয়-অজর অক্ষর
অধ্যাপক-দাঁত
নেই— চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি;
বেতন হাজার টাকা
মাসে-আর হাজার দেড়েক
পাওয়া যায় মৃত
সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি;
যদিও সে সব কবি
ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক
চেয়েছিল— হাঙরের ঢেউয়ে খেয়েছিল লুটোপুটি।’
[সমারূঢ়:
সাতটি তারার তিমির: জীবনানন্দ দাশ]
কবি-চিত্তের এই
সংক্ষোভাক্রান্ত অভিব্যক্তিই তো কবিতার পথ-পরিক্রমায় অনন্ত যুদ্ধের নজির। কবিকে
যুদ্ধ করেই এগিয়ে যেতে হয় কবিতার পথে; রক্ষা করতে হয় কবিতার সার্বভৌমত্ব, অধিস্বত্ব
এবং অধিবাস। উদ্ধৃত কবিতার ভাব ও ভাষা থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে অজর অক্ষর
অকবি অধ্যাপক ও পণ্ডিতকুল চিরকালই তাঁদের সমকালের সৃষ্টিশীল কবিদেরকে উপহাস ও
উপেক্ষা করেন, তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করেন। এঁরা জীবননিষ্ট
শিল্প-ভাস্কর কবিদের প্রতিপক্ষ, শত্রুপক্ষ। এসব তথাকথিত
তাত্ত্বিক বোদ্ধা ও প্রাজ্ঞরা পূর্বকালের মৃত কবিদের পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য ও টীকা খুঁটে এবং কুটে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করলেও পার্শ্বজন
কবিদের প্রতি পোষণ করেন হীনম্মন্যতা জনিতা ঈর্ষা। আবার সাহিত্য জগতের সারথি হওয়ার
দাবিদার এক শ্রেণির কবি, লেখক, সমালোচক
ও সম্পাদকও জাত কবিদের যাতনার কারণ হয়ে থাকেন। এঁরা মৌলিক প্রতিভায় অনুসিক্ত
শক্তিমান শিল্প-স্রষ্টাদের উচ্চকীয়তা অনুধাবনে অক্ষম। তাই প্রকৃত কবিদের
সৃষ্টিকর্মগুলিকে হয় এঁরা ইগনোর করেন নয়তো সেসব নিয়ে নানা রকম নেতিবাচক ও
নিন্দাসূচক কথা ব’লে নিজেদের ক্ষীণতা, শীর্ণতা ও দীনতা
ঢাকার প্রয়াস পান; যেমন- বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বৃহত্তর
বৃটিশ-বাংলার রাজধানী কলকাতার সাহিত্য অঙ্গনে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার স্বনামধন্য
সম্পাদক শ্রী সজনীকান্ত দাস এবং সুরেশ সমাজপতিসহ সময়ের আরো কিছু পরিচিত
কবি-সাহিত্যিক বাঙালির জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও রূপসী বাংলার শুদ্ধতম কবি
জীবনানন্দ দাশকে নানাভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। তাঁদের কাব্য-সাহিত্যের
অন্তশাঁসকে অন্তঃসারশূন্য প্রমাণ করার লক্ষ্যে এন্তার কসরত চালিয়েছেন কাগজের পাতায়
ও মুখের কথায়। এমনকি কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত বিব্রত করতে ছাড়েননি। একইভাবে
ইংল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কবি John Keats- এর
অপূর্ব শব্দশৈলী এবং ভাব ও ধ্বনি-ব্যঞ্জনার সৌন্দর্যে পরিমণ্ডিত কবিতা নিয়েও
বীভৎস নিন্দাচারে ব্যাপৃত ছিল সেকালের Tory Reviewers নামের
এক ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা। এই সব প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা
ও পরশ্রীকাতরতার সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে অগ্রধাবি হতে হয় কবিকে,
কবিদেরকে। সুতরাং কবিতা-পথের পরিভ্রমণ ও পরিব্রাজন মোটেও মসৃণ
নয়, অসংকুল নয়; বরং বড়ই বন্ধুর ও
বিড়ম্বনাময়। কবি-খ্যাতি ও কাব্য-শিল্পের গন্তব্য ভীষণ বিরূপতায় আবিষ্ট এবং অতিশয়
দূরান্বয়ী ও দুর্গম। কারণ কবিরা চিরকালই নিঃসঙ্গ এবং স্বার্থবাদী শক্তি-বলয়ের কাছে
তাঁরা অবহেলিত এবং উপেক্ষিত।
জাগতিক জীবনে
সংঘটিত সব রকমের অনাচার, অবিচার
ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সদা সচেতন ও জাগ্রত থাকে কবিদের সংবেদনশীল মন ও মানস। তাঁরা
সত্যের সাধক, সৌন্দর্যের পূজারি; তাঁদের চিত্ত সতত বিচলিত হয় জীবনের বঞ্চনা, লাঞ্ছনা
ও যন্ত্রণা দেখে। তখন তাঁরা তাঁদের মননের সবটুকু নির্যাস ঢেলে মূকের জবানিতে
মুখরিত করেন মুক্তির গান, দৃপ্ত বাণীর বাণে সহসা ঘটাতে
চান অপশক্তির অবসান, নির্মাণ করতে চান শোষণ, প্রেষণ ও বৈষম্যমুক্ত প্রেমময় এক মানবিক বিশ্ব। আর তখনই কবি-কল্পের
সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের দানবীয় শক্তি নিচয়। কবির
কণ্ঠকে তারা স্তব্ধ করতে চায়, অবরুদ্ধ করতে চায়।
নিশ্চিহ্ন করতে চায় তাঁদের স্বপ্ন-সৌন্দর্যের মানবীয় প্রয়াসগুলি। সম্ভবত এমন
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই নাইজেরিয়ার নোবেল জয়ী সাহিত্য ব্যক্তিত্ব Wole
Soyinka বলেছেন- ‘Books and all sorts of writing are
terror to those who wish to suppress the truth’ তিনি আরো
বলেছেন- ‘Power is domination, control, and therefore a very selective
form of truth which is a lie.’ কবি-সাহিত্যিক ও বিশুদ্ধ
চিন্তকদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির নানামুখী নির্যাতনের নমুনা স্বরূপ বলা যায়- King
Richard-ii-এর সমালোচনা করার অপরাধে চিরতরে হারিয়ে যান England
-এর ১৪ শতকের তুখোড় প্রতিভাধর কবি, অমর
কাব্য ‘Piers the Plowman’-এর রচয়িতা William
Langland. কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে দুঃসহ যন্ত্রণায় গোঙাতে
হয় বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা মহাকবি ‘Paradise Lost’ ও
‘Paradise Regained’-এর স্রষ্টা John Milton -কে। বিশ্বাস ও চিন্তার স্বাধীনতা দাবি করায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত
হতে হয় প্রগতির প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত কবি পি. বি. শেলীকে। বর্বর রুশ-সম্রাট
নিকোলাসের দণ্ডাজ্ঞায় সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হন শতাধিক প্রতিভাদীপ্ত কবি; ফাঁসির রজ্জুতে লট্কে থাকে জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি পুশকিনের মৃহদেহ।
সারা দুনিয়ায় নন্দিত বোধ-মননের মহান কবি পাবলো নেরুদার ঠাঁই মেলেনি তাঁর স্বদেশ
‘চিলির’ মাটিতে। নাইজেরিয়ার আরেক জীবনবাদী কবি Chris Abani -কে ছাড়তে হয় তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি। ‘এ দেশ ছাড়বি কিনা বল নইলে কিলের
চোটে হাড় করিব জল’ উচ্চারণের মুক্তিকামী কণ্ঠস্বর বঙ্গজনতার প্রাণের কবি কাজী
নজরুল ইসলামকে খাটতে হয় জেল; কয়েদ-খানার অন্ধঘরে পালন
করতে হয় দীর্ঘতম অনশন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের জেল-জুলুমের শিকার হতে হয় বাংলার
পল্লীকবি জসীম উদ্দীনকে। বৃটিশ-ভারতের জালিয়ান ওয়ালাবাগে পরিচালিত অমানবিক
নির্যাতনের প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুরকে ঘৃণাভরে প্রত্যর্পণ করতে হয়
বৃটিশরাজের নাইট উপাধি। ‘শুনো হে মানুষ ভাই, সবার উপরে
মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ প্রভাষণের মানবতাবাদী প্রবক্তা বাংলা সাহিত্যের
প্রাচীন কবি চণ্ডীদাসকে জান্তব নির্যাতনে বরণ করতে হয় নিষ্ঠুর মরণ। হালকালে
পশ্চিমবঙ্গের দলিত লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারীকে দীর্ঘকাল বইয়ে বেড়াতে হয় দুর্বিষহ
কষ্টের জীবন। গ্রিক দর্শনের প্রথম বর্তিকা সক্রেটিস কবি ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন কবিদের ধ্যানক্ষেত্র সত্যান্বেষার দিগদিশারী,
জ্ঞানান্বেষার মগ্ন সাধক। কবিদের জ্ঞাতি জাতক মহান এই
সত্য-সাধককে রাজঈর্ষার কবলে পড়ে প্রাণ হারাতে হয় ভয়ংকর বিষ হেমলক পানে। এসব
বহির্যাতনার পাশাপাশি কবিদেরকে ব্যাপক আত্মদহনের যন্ত্রণাও সইতে এবং বইতে হয়। কারণ
অন্তর্গত এক অদৃশ্য তাড়নার বশবর্তী হয়ে তাঁরা অজানাকে জানতে চান, রহস্যাবৃত গোপন সত্যকে উদ্ঘাটন করতে চান। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশের
প্রখ্যাত ফরাসি কবি আতুর্র ব্যাঁবোর (Arthur Rimbaud) মতে
‘সমস্ত মানুষের মধ্যে কবি হচ্ছেন সবচেয়ে অত্যাচারিত, সবচেয়ে
বড় অপরাধী, অভিশপ্ত, আবার
মহাজ্ঞানী, কেননা তিনি অজানার সমুখে দণ্ডায়মান।’ এমনতর
বিচিত্রমুখী প্রতিবন্ধকতা ও নির্যাতন-নিষ্পেষণের বন্ধুর পথ পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয়
কবিকে, কবির জ্ঞাতিকে; জাগ্রত
রাখতে হয় কাব্যশিল্পের নন্দন-চারু এবং জৈবনিক ভাবদর্শন ও মানবীয় প্রত্যয়ের প্রগাঢ়
অন্তর্চেতনা। জানা যায় প্লেটোর গুরু সক্রেটিসও মৃত্যুপূর্ব জেল জীবনে কবি ও কবিতা
নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু প্লেটো সে পথে না গিয়ে তাঁর প্রস্তাবিত আদর্শ
রাষ্ট্র থেকে বরং কবিদেরকে নির্বাসিত করলেন। কবি ও কবিতার বিরুদ্ধে আনিত তাঁর
অভিযোগগুলি হলো- কবিতা চর্চার মাধ্যমে মানুষের মূল্যবান কর্মসময় বিনষ্ট হয়,
কবিতা সকল মিথ্যাচারের জননী, কবিতা মানব
মনে কামুকতানিষ্ট দুষ্টু আবেশ সৃষ্টি করে, এবং কবিতা
মানুষকে কর্মবিমুখ ও অলস ক’রে তোলে। অন্যদিকে Stephen Gosson -তো কবিদেরকে ‘enemies to virtue’ বলেই অভিহিত
করেছেন। খ্যাতির শীর্ষে অবস্থানকারী আধুনিক বাঙালি কবি ও কাব্যালোচকদের মধ্যে
অন্যতম শ্রদ্ধেয় বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘কবিতার শত্রু ও মিত্র’ পুস্তিকায় প্লেটো,
রুশো, সেন্ট অগাস্টিন এবং টলস্টয়ের
কাব্য বিরোধী মনোভাব নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে টলস্টয়
জগতের সকল শিল্পকে ‘মিথ্যা শিল্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং নিজের সৃষ্টিকে
বলেছেন ‘কুশিল্প’। আর বিদগ্ধ পণ্ডিত শিবনারায়ণ রায় তাঁর ‘কবির নির্বাসন’ শীর্ষক
প্রবন্ধে প্লেটোর কাব্যবিরোধিতাকে খানিকটা আশকারা দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি
স্বীকার করেছেন যে প্লেটো তাঁর প্রথম জীবনে ছিলেন একজন কবি। তবে আমাদের জন্য আশার
কথা এই যে প্লেটোর নিজেরই শিষ্য সর্বকালের সর্বসেরা তত্ত্বচিন্তক Aristotle
এসে সুদৃঢ় যুক্তি উপস্থাপনার মাধ্যমে কবি ও কবিতাকে উদ্ধার করলেন
সেই নির্মম নির্বাসন থেকে। আরেক দিকে তাঁর অনেক পরে আধুনিক কালের ইংরেজ কবি ও
কাব্যতাত্ত্বিক Philip Sidney যথাযথ জবাবের মাধ্যমে কবিতা
সংক্রান্ত সকল অভিযোগ খণ্ডন করলেন এবং খোদ Plato -কেও
তিনি সম্বোধন করলেন একজন জাত কবি হিসেবে। তিনি বললেন- ‘Plato himself was
a born poet, and a large part of his Dialogues is poetic. In his Ion, he gives
high and rightly divine commendation unto poetry.’
কবিতা প্রসঙ্গে
ধর্মের দিকে তাকালে দেখা যায় ইসলামের ঐশী গ্রন্থ পবিত্র কোরআনের ‘শো অর’ (কবিগণ)
নামীয় সূরার ২২১ থেকে ২২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘(শয়তানের উক্তিতে) তাহারা
কর্মস্থাপন করে এবং তাহাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী এবং কবি, বিপথগামী লোকেরা তাহাদের অনুসরণ করে। তুমি কি
দেখ নাই যে নিশ্চয় তাহারা প্রত্যেক প্রান্তরে ঘুরিয়া বেড়ায় এবং যাহা করে না তাহারা
তাহা বলে।’ উল্লেখ্য সুরাটির শিরোনাম ‘কবিগণ’ হলেও এতে মাত্র একবারই কবিবিরোধী
কথা বলা হয়েছে এবং পুরো কোরআন শরীফের অন্য কোথাও আর এমন উক্তি পাওয়া যায় না।
তবে একটি হাদিসে নবি (সা.) বলেছেন- ‘কোনো লোকের পেট মিথ্যা কবিতার দ্বারা
পরিপূর্ণ হওয়া অপেক্ষা উহা পূঁজে পরিণত হওয়া অনেক ভাল যাহা উদর বা পেটকে নষ্ট
করিয়া ফেলে।’ কিন্তু ইতিহাস থেকে জানা যায় পরবর্তীতে তিনি নিজেও কবিতা শুনতেন এবং
ইসলামের পক্ষে কবিতা লেখার জন্য কবিদেরকে উৎসাহ প্রদান করতেন। তাহলে বুঝা যাচ্ছে
কোরআন শরীফে কবিবিরোধী যে একক বক্তব্যটি এসেছে তা শুধু ইসলাম ও নবীর নামে কুৎসা
রটনাকারী কবিদের উদ্দেশ্যেই উচ্চারিত হয়েছে। তবে একথাও সত্য যে সেই সময়ের আরবরা
ইসলামের প্রতি অতিমাত্রায় নিমগ্ন হয়ে পড়ায় তাদের কাব্যচর্চার প্রাচীন ঐতিহ্যটি তার
জৌলুস হারিয়ে ফেলে। যেমন জনসমাবেশে কবিতা পাঠ ও
বিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা সেসব কবিতার মান মূল্যায়ন সংক্রান্ত ‘উকাজের কবিতা মেলা’
এবং কাবা ঘরের দেয়ালে কবিতা ঝুলানোর রেওয়াজটি তখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
কবিকে তাঁর নিজ
গৃহেও লিপ্ত হতে হয় কবিতা যাপনের যুদ্ধে। কবিরা বহেমিয়ান, উদাসীন এবং উড়নচণ্ডী, এমনকি
দায়িত্বজ্ঞানহীন-এমনটাই মনে করে যুগযুগান্তের প্রথাবদ্ধ সমাজ ও সংসার। কাব্যচর্চার
বিনিময়ে কবির সংসার-চাহিদার কোনো পণ্য মেলে না, মেটে না
কবি পরিবারের সদস্যদের বিলাস ও বিনোদনের সাধ। তাই কবির প্রতি অনেক ক্ষেত্রেই চরম
ক্ষুব্ধ থাকেন কবির স্পাউজ এবং সন্তান-সন্ততিসহ অপরাপর আপনজনেরা। বিষয়ী ভাবনায় সবল
এবং চালাক ও বুদ্ধিমান লোকেরা, এমনকি কোনো কোনো
জ্ঞানদীপ্ত বড় বিদ্বান ও তথাকথিত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরাও, কবিকে-
‘ওহ্ উনি তো আবার কবি, কি হে কবি, কী খবর কবি সাহেব’ ইত্যাকার শ্লেষাত্মক অভিধায় সম্বোধন ক’রে এক ধরনের
বিকৃত আনন্দ লাভ করেন। অনুমান করা যায়, হয়ত এসব কারণেই
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো গুণী সাহিত্যিকও আক্ষেপ ক’রে বলেছেন- ‘দু’টো
ডালভাতের ব্যবস্থা না ক’রে সাহিত্য চর্চায় হাত দেয়া ঠিক নয়।’ বাংলা সাহিত্যের
কিংবদন্তি কবি জীবনানন্দ দাশ নিখিল বাংলার কাব্যপ্রেমীদের কাছে আজ যতটা প্রিয়
জীবতকালে এর চেয়ে অধিক অপ্রিয় ছিলেন নিজের স্ত্রীর কাছে। কলেজ শিক্ষকতার পেশাতেও
তিনি স্থিতি লাভ করতে সক্ষম হননি। তাঁকে একের পর এক বদলাতে হয়েছে কর্মস্থল। কারণ
সম্ভবত এই ছিল যে তিনি কূটবুদ্ধি সম্পন্ন কর্তৃপক্ষ এবং স্বার্থবাদী সহকর্মীদের মন
যোগাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরম ভালোবাসার চাকা ফিরে আসার অপেক্ষায় চরম নিঃসঙ্গতায়
জীবন কাটাতে হয়েছে বোধি বপনের কবি বিনয় মজুমদারকে। জনহীন ঘরের অন্ধকার কোণে
একাকী মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে দরাজদিল প্রেমিক কবি আনোয়ার আহম্মদকে। কথিত আছে প্রায়
আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মাথায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তাঁর
ক্ষিপ্ত স্ত্রীর হাতের গরম জল।
কবিদের বিরুদ্ধে
এই যে এতো এতো অভিযোগ-অপবাদ, তাঁদের চলার পথে এতো যে প্রতিরোধ-প্রতিবন্ধকতা তা সত্ত্বেও তারা থেমে
যাননি, অবনমিত বা অবদমিত হননি। বড় পদ, সম্পদ ও প্রতিপত্তির রঙিন পালকধারী মানুষদের ভ্রুকুটিকে আমলে নেননি
আদৌ। ‘শাহনামার’ কবি ফেরদৌসী মাথা নোয়াননি দিগ্বিজয়ী বীর গজনীর বাদশা সুলতান মাহমুদের
কাছে। বরং আত্মচেতনাস্থিত মানবিক দায়বোধে তাড়িত হয়ে পৃথিবীর সকল মহৎ কবি অবিরাম
এগিয়ে চলেছেন কল্পনাসৃত সত্য এবং আদর্শের পথে, সৌন্দর্যঋদ্ধ
শিল্প সৃষ্টির পথে। সভ্যতার সড়কপথ সাক্ষী, অনেক অনেক
নিন্দুকের বিপরীতে কবিদের জন্য অসংখ্য অভিনন্দন ও প্রশংসাকারীও আবির্ভূত হয়েছেন
সকল যুগে। মানব সমাজ অতিশয় হৃষ্টচিত্তে স্বাগত জানিয়েছে কবিদেরকে, কবিদের কবিতাকে। প্রাচীন কালের রোমান ও গ্রিকরা কবিদেরকে Vates
উপাধিতে ভূষিত করেছেন যার অর্থ Seer বা Prophet.
এই ধারণার সূত্র ধরেই তারা কবিদেরকে বলতেন ‘Father of
learning’. ইংল্যান্ডের আধুনিক কবি ও কাব্যবিদ Mathew
Arnold বলেছেন- ‘Poetry is a criticism of life "
and ‘Poetry is an application of ideas to life.’ আর রোমান্টিক
যুগের প্রধান কবি William Wordsworth মনে করেন- ‘Poetry
is the breath and spirit of all knowledge.’ সবশেষে বলা যায়
কবিরা পার্থিব জীবন সমগ্রের সদর্থক ভাষ্যকার, ভাস্কর ও
উপস্থাপক। অন্য কথায় কবিতা মানুষের মন, মনন, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার চিত্র-বয়ান। এই শিল্প মানুষের চিত্তগত অবসাদ
তাড়ানোর টনিক, সত্য জানার সিঁড়ি, এবং প্রেম ও ভালোবাসার কল্লোল ধারা। কবিতার ভেতরে নিহিত থাকে জৈবনিক
গতির মন্ত্র, অজানাকে জানার এষণা। সুতরাং বিশ্বসভ্যতার
অগ্রাভিগমনের সুদীর্ঘ যুদ্ধযাত্রায় কবিরাই সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা এবং চূড়ান্ত
বিজেতাও তাঁরাই।
সেপ্টেম্বর, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ
তথ্যসূত্র:
i. Sidney’s ‘An
Apology for Poetry’
Dr.
Raghukul Tilak
Rama
Brothers
Bank
street, Karol Bagh
New
Delhi-110005, Sixth Edition-1988
ii. Mathew
Arnold: The Study of Poetry
Ramji
Lall: Aaroti Book Center
New
Delhi-8: Eighteenth Edition-2000
iii. John
Milton: Paradise Book-1
Aarote
Book Center
New
Delhi-8
Nineth
Edition-1979
iv. John Keats:
Selected Poems
Dr.
S. Sen
Unique
Publishers
Lajpat
Nagare, New Delhi-110024
v. কবিতা যখন অভিযুক্ত: মাশুক চৌধুরী
নতুন দিগন্ত: সপ্তদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০০৯
vi. ভূমিকা
: পরাবাস্তব কবিতা
আবদুল মান্নান সৈয়দ
vii. ইন্টারনেট
vii. কাজী
নজরুল ইসলাম/বর্তমান বিশ্বসাহিত্য
প্রবন্ধ সংগ্রহ/ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়/ ১৯৯২, পৃষ্ঠা-২৫১

0 মন্তব্যসমূহ